new-yearধুলোপড়া অতীত পেছনে ফেলে আজ নতুন বছরকে বরণ করে নেবে বাঙ্গালী। নতুন স্বপ্ন বুনবে বাংলার কৃষক। হালখাতা খুলবে ব্যবসায়ীরা। নববর্ষ বরণে রাজশাহীসহ সারাদেশ একযোগে চলবে লোকজ ঐতিহ্যের নানা উৎসব অনুষ্ঠান। আজ সরকারী ছুটির দিন। দেশবাসীকে বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

আবহমান কাল ধরেই চলছে বৈশাখ বরণের আনুষ্ঠানিকতা। প্রকৃত রূপটি দৃশ্যমান হয় গ্রামে। এক সময় গ্রামবাংলায় চৈত্রসংক্রান্তি ছিল প্রধান উৎসব। বছরের শেষ দিনে তেতো খাবার খেয়ে শরীর শুদ্ধ করতেন কৃষাণ-কৃষাণীরা। নির্মল চিত্তে প্রস্তুত হতেন নতুন বছরে প্রবেশ করার জন্য।

বৈশাখ বরণ করতে বহুকালের রীতি মেনে বাড়িঘর ধুয়েমুছে পরিষ্কার করেন গৃহিণীরা। অদ্ভুত মুন্সিয়ানায় আল্পনা আঁকেন মাটির মেঝেতেও। যথারীতি খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠবেন সবাই। স্নান সারবেন। অনেকেই নতুন পোশাকে সাজবেন। আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীর বাড়িতে বেড়াতে যাবেন।

নতুন বছরকে বরণ করে নিতে গোটা জাতি অপেক্ষা করে পুরো একটি বছর। প্রতীক্ষার অবসানে বাঙালির সে কী বাঁধভাঙা উল্লাস। আর তাই হৃদয়ের সবটুকু উষ্ণতা দিয়ে বৈশাখকে বরণও করে নেয়। পূর্ব দিগন্তে সূর্যের আগমনে, কথা আর সুরে ধ্বনিত হবে গোটা জাতির মঙ্গলবার্তা। আর এই মঙ্গলালোকে স্নাত হতে বাঁধভাঙা জোয়ারে মানুষ আছড়ে পড়বে শহর-বন্দরসহ প্রতিটি জনপদে।

উৎসবপ্রিয় বাঙালিকে গ্রীষ্মের দাবদাহ আজ রুখতে পারবে না। বর্ষবরণের উৎসবের আমেজে মুখরিত থাকবে আজ বাংলার চারদিক। দেশের পথে-ঘাটে, মাঠে-মেলায়, অনুষ্ঠানে থাকবে কোটি মানুষের প্রাণচাঞ্চল্য আর উৎসবমুখরতা। পহেলা বৈশাখের শুভ লগ্নের আনন্দে আজ বাঙালি ধর্মান্ধ অপশক্তির কূট-ষড়যন্ত্রের জাল ভেদ করার আর কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অনুপ্রেরণা নেবে, হবে ঐক্যবদ্ধ। চিরাচরিত ঐতিহ্য অনুযায়ী ধর্ম-বর্ণ, ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবাই মেতে উঠবে বৈশাখী উৎসবে।

পহেলা বৈশাখ ঠিক কবে থেকে পালিত হয়ে আসছে, তা নিয়ে পন্ডিতদের মধ্যে রয়েছে মতভেদ। বিভিন্ন বই-পুস্তক ঘেঁটে জানা যায়, হিন্দু সৌর পঞ্জিকা অনুসারে বাংলা ১২টি মাস অনেক আগে থেকেই পালিত হতো। এই সৌর পঞ্জিকার শুরু হতো গ্রেগরীয় পঞ্জিকায় এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে।

হিন্দু সৌর বছরের প্রথম দিন আসাম, বঙ্গ, কেরালা, মণিপুর, নেপাল, উড়িষ্যা, পাঞ্জাব, তামিলনাড়ু এবং ত্রিপুরার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অনেক আগে থেকেই পালিত হতো। এখন যেমন নববর্ষ নতুন বছরের সূচনার নিমিত্তে পালিত একটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে, একসময় এমনটি ছিল না।

তখন নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ আত্ম উৎসব তথা ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে পালিত হতো। তখন এর মূল তাৎপর্য ছিল কৃষিকাজ। প্রযুক্তি প্রয়োগের যুগ শুরু না হওয়ার আগ পর্যন্ত কৃষকদের ঋতুর ওপরই নির্ভর করতে হতো।

বাংলা নববর্ষের সঙ্গে সবচেয়ে নিবিড় সম্পর্ক কৃষির। এ সম্পর্কের সূত্রেই বাংলা সাল প্রবর্তন করেন সম্রাট আকবর। তাঁর আমলেই প্রবর্তন হয় বাংলা সাল। এখন তা বঙ্গাব্দ নামে পরিচিত। বৈশাখ নামটি নেয়া হয়েছিল নক্ষত্র বিশাখার নাম থেকে। কালের বিবর্তনে নববর্ষের সঙ্গে সম্পর্কিত অনেক পুরনো আচার অনুষ্ঠানের বিলুপ্তি ঘটেছে। আবার যুক্ত হয়েছে অনেক নতুন আয়োজন।

ইতিহাস বলে, ভারতবর্ষে মোগল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সম্রাটরা হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে কৃষিপণ্যের খাজনা আদায় করতেন। কিন্তু হিজরি সন চাঁদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি ফলনের সঙ্গে মিলত না। এতে অসময়ে কৃষকদের খাজনা পরিশোধ করতে বাধ্য করা হতো। খাজনা আদায়ে সুষ্ঠুতা প্রণয়নের লক্ষ্যে মোগল সম্রাট আকবর বাংলা সন প্রবর্তন করেন।

তিনি মূলত প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কার আনার আদেশ দেন। সম্রাটের আদেশমতে, তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজি সৌর সন এবং আরবি হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম তৈরি করেন। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ বা ১১ মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় (৫ নভেম্বর, ১৫৫৬) থেকে। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন। পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিতি লাভ করে।

পহেলা বৈশাখ উদযাপন আকবরের শাসনামল থেকেই শুরু হয়। চৈত্র মাসের শেষ দিন, অর্থাৎ চৈত্রসংক্রান্ত্রির দিনে সব খাজনা, মাসুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে হতো। এর পরদিন, অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভূমিমালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদের মিষ্টান্ন দ্বারা আপ্যায়ন করতেন। এ থেকেই হালখাতার প্রচলন শুরু হয়।

গ্রাম-গঞ্জে মানুষ আবহমানকাল ধরেই পহেলা বৈশাখ পালন করে এলেও শহরে পালন শুরু হয়েছে উনিশ শতকে। দেশে তখন স্বদেশি আন্দোলনের যুগ। ব্রিটিশদের ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’ ধারণাকে দাঁতভাঙা জবাব দিতে গ্রামে-গঞ্জের সর্বজনীন উৎসব পহেলা বৈশাখ নাগরিকরা উদযাপন করতে শুরু করে। ক্রমেই জনপ্রিয়ও হয়ে ওঠে এই উৎসব।

পাকিস্তান আমলে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী পহেলা বৈশাখ পালনের ব্যাপারটিকে সুনজরে দেখেনি। এ ব্যাপারে হিন্দুয়ানিসহ বিভিন্ন অভিযোগ তোলা হয়েছিল। বাংলা নববর্ষ উদযাপনের ক্ষেত্রে রাজধানী ঢাকায় ১৯৬৫ সালে যুক্ত হয় নতুন মাত্রা। ওই বছর রমনার বটমূলে সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ছায়ানট’ আয়োজন করেছিল বর্ষবরণ অনুষ্ঠান।

এরপর থেকে প্রতি বছর রমনার বটমূলে অনুষ্ঠিত হয় বর্ষবরণ অনুষ্ঠান, যা এখন বাংলা বর্ষবরণের প্রধান উৎসব। বর্ষবরণের সবচেয়ে বর্ণাঢ্য আয়োজনটির নাম মঙ্গল শোভাযাত্রা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে এবারও পহেলা বৈশাখ সকালে এই শোভাযাত্রা বের করা হবে।