সৌরবিদ্যুৎ এশিয়ায় সবচেয়ে ব্যয়বহুল বাংলাদেশে

198
Web hosting

এসপিবি.এন নিউজ – অনলাইন ডেস্ক: দেশে সৌরবিদ্যুতের জনপ্রিয়তা ঈর্ষণীয়। প্রতি মাসে গড়ে ৬৫ হাজার নতুন সোলার হোম সিস্টেম (এসএইচএস) স্থাপন হচ্ছে। জাতীয় সঞ্চালন লাইন পৌঁছানো সম্ভব হয়নি, এমন অঞ্চলে এরই মধ্যে বসেছে প্রায় ৪৫ লাখ সোলার হোম সিস্টেম। যদিও বিকল্প উেসর এ বিদ্যুৎ পেতে গ্রাহককে পরিশোধ করতে হচ্ছে উচ্চমূল্য। এ মূল্য পার্শ্ববর্তী দেশ, এমনকি এশিয়ার মধ্যেও সর্বোচ্চ। আর উচ্চমূল্যে সোলার সিস্টেম বিক্রির কারণে অতিরিক্ত মুনাফা করছে এ ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা।

দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎসাহিত করতে কাজ করছে সরকারি সংস্থা সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (স্রেডা)। প্রতিষ্ঠানটির তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে প্রতি কিলোওয়াট ক্ষমতার একটি সৌর প্যানেল স্থাপনে ব্যাটারিসহ ব্যয় হয় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রতি ওয়াটের দাম পড়ে ১২০ টাকা।

কিন্তু বাজার ঘুরে দেখা যায়, এ দামের তিন-চার গুণ মূল্যে প্যানেল বিক্রি হচ্ছে। সোলার পাওয়ার অ্যান্ড ইলেকট্রিক ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হোম সিস্টেমসহ প্রতি ওয়াটের দাম রাখা হচ্ছে ৩৭৫ টাকা।

যদিও এর চেয়ে অনেকে কম দামে সোলার হোম সিস্টেম কিনতে পারছেন এশিয়ার অন্যান্য দেশের গ্রাহকরা। ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালিসিসসহ (আইইইএফএ) আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, ভারতে ২৫০ ওয়াটের একটি সোলার হোম সিস্টেম বিক্রি হয় ৮ হাজার ৫১৪ রুপিতে। এ হিসাবে প্রতি ওয়াটের দাম পড়ে ৩৪ রুপি বা বাংলাদেশী মুদ্রায় ৪১ টাকা। পাকিস্তানে ৪৫০ ওয়াটের সিস্টেম স্থাপনে ব্যয় হয় ৫৩ হাজার রুপি। এ হিসাবে প্রতি ওয়াটের দাম দাঁড়ায় ১১৭ রুপি, বাংলাদেশী মুদ্রায় যার পরিমাণ ৯০ টাকা। এছাড়া থাইল্যান্ডে দেড় হাজার ওয়াটের একটি সোলার প্যানেলের জন্য গ্রাহককে ব্যয় করতে হয় ৫৬ হাজার বাথ, ওয়াটপ্রতি যার দাম পড়ে ৩৮ বাথ বা ৮৬ টাকা।

দামের তুলনামূলক এ চিত্রই বলছে, বাংলাদেশে সৌর প্যানেলের সরকার ঘোষিত দামই এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি। বাংলাদেশে সোলার প্যানেলের দাম নিয়ে উদ্বিগ্ন বিদ্যুৎ বিভাগও। এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, আমরা সোলার প্যানেলের দাম যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসতে কাজ করছি। ব্যবসায়ীদেরও এ বিষয়ে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, যাতে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে তারা সোলার প্যানেল বিক্রি করেন।

সৌরবিদ্যুতের জনপ্রিয়তা ও প্রযুক্তি সহজলভ্যতার কারণে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও এখন সোলার প্যানেল উৎপাদন হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে সাত-আটটি প্রতিষ্ঠান সোলার মডিউল উৎপাদন করছে। পাশাপাশি ভারত ও চীন থেকে প্রয়োজনীয় সোলার মডিউল আমদানি করা হচ্ছে। এসব মডিউল রহিমআফরোজ, টিএমএসএসসহ প্রায় ৫৬টি সংস্থার মাধ্যমে বিতরণ করা হয়। গ্রাহক পর্যায়ে এ প্যানেল স্থাপনে অর্থায়ন সুবিধা দেয় সরকারি প্রতিষ্ঠান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল)। পরে তা গ্রাহকের কাছ থেকে পর্যায়ক্রমে তুলে নেয় প্রতিষ্ঠানটি।

অতিরিক্ত দামে সোলার মডিউল বিক্রির কারণে বড় অংকের মুনাফা করছে বিতরণকারী কোম্পানি। পাশাপাশি মুনাফা করছে অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানও। ইডকলের ২০১৪-১৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন ঘেঁটে দেখা যায়, ওই অর্থবছরে সব ধরনের কর পরিশোধের পর প্রতিষ্ঠানটি মুনাফা করে ১২৯ কোটি টাকার বেশি।

সোলার মডিউলের মাধ্যমে বিতরণ ও অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান বড় অংকের মুনাফা করলেও বাড়তি দাম এক ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে প্রান্তিক গ্রাহকদের ওপর। এমন একজন গ্রাহক গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার হিয়াতপুর গ্রামের বাসিন্দা মোশারফ হোসেন রাসেল। ২০১০ সালে একটি বেসরকারি সংস্থার কাছ থেকে ৮৫ ওয়াটের একটি সোলার প্যানেল নেন তিনি। দুই কিস্তিতে ওই প্যানেলের বিপরীতে তাকে পরিশোধ করতে হয় ৪১ হাজার ৫০০ টাকা। অর্থাৎ ওই প্যানেল কিনতে ওয়াটপ্রতি তাকে খরচ করতে হয়েছে ৪৮৮ টাকা।

জানতে চাইলে স্রেডার সদস্য (জ্বালানি দক্ষতা ও সংরক্ষণ) সিদ্দিক জোবায়ের বলেন, অন্যান্য দেশের যে দাম আমরা দেখি, সেটা শুধু মডিউলের। কিন্তু আমাদের এখানে যে দামটা নেয়া হয়, তা পুরো সিস্টেমের। এ কারণে অন্যদের চেয়ে আমাদের ব্যয়টা বেশি মনে হয়। তাছাড়া দেশে ব্যবহূত সৌর প্যানেলের বেশির ভাগই এখনো আমদানিনির্ভর। আমদানি করতে গেলে পরিবহন ও অন্যান্য কর যোগ হয়ে ব্যয় একটু বাড়বে এটাই স্বাভাবিক। এছাড়া দেশে যারা উৎপাদন করে, তাদেরও বিদেশ থেকে প্রকৌশলী আনতে হয়।

তবে সোলার হোম সিস্টেমের এ উচ্চমূল্যের মধ্যেও প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার। স্রেডার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রতি মাসে ৬৫ হাজারের বেশি সোলার হোম সিস্টেম স্থাপন হচ্ছে, যা প্রতি বছর গড়ে ৫৮ শতাংশ হারে বাড়ছে। এর মাধ্যমে বাসাবাড়িতে প্রতি বছর কেরোসিন সাশ্রয় হচ্ছে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার টন।

বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাবে, বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি মিলে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ১৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদন সক্ষমতা এর ২ দশমিক ৭৬ শতাংশ বা ৪২৯ মেগাওয়াট। এর মধ্যে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদনক্ষমতা ২৩০ মেগাওয়াট ও ১৯৫ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ।

তবে বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২১ সাল নাগাদ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ১০ শতাংশ বা দুই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য ধরা হয়েছে।

– bonikbarta.net