১৯৯০। ইতালিতে বসলো বিশ্বকাপ ফুটবলের চৌদ্দতম আসর। ৮ জুলাই রোমের স্টেডিও অলিম্পিকোতে ফাইনাল। ৭৩,৩০৬ জন দর্শকের মাঝে জার্মানদের প্রতিপক্ষ ছিয়াশির চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হয়ে ম্যারাডোনার দল মাঠে নামলেও ইতালি বিশ্বকাপে ধুকতে ধুকতে, আর কোনো রকমে ভাগ্যের সহায়তায় ফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা।

প্রথম রাউন্ডে মাত্র একটি জয় আর একটি ড্র সঙ্গী করে ৩ পয়েন্ট নিয়ে ওঠে রাউন্ড অব সিক্সটিনে। রোমানিয়ার পয়েন্ট ৩ আর ক্যামেরুন ৩ ম্যাচে ৪ পয়েন্ট নিয়ে হয় গ্রুপ সেরা। ১৯৮৬‘র চ্যাম্পিয়নরা তাদের প্রথম ম্যাচেই ক্যামেরুনের কাছে হয় আপসেটের শিকার (আজেন্টিনা ০-১ ক্যামেরুন)। তবে গ্রুপ পর্বে একমাত্র যে জয়টি ম্যারাডোনার দলের, তা ভাগ্যক্রমে ছিল ওই রোমানিয়ার বিরুদ্ধেই। তাই রক্ষা।

শেষ ষোলতে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ হিসেবে পায় ব্রাজিলকে। এবার ১-০ গোলে জয়। কোয়ার্টারে যুগোস্লাভিয়াকে টাইব্রেকারে ৩-২ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনালের পথে হাঁটে আর্জেন্টিনা। স্বাগতিক ইতালির বিপক্ষেও এলো আরাধ্য জয়। এবারও টাইব্রেকার। ফলাফল- আর্জেন্টিনা ৪, ইতালি ৩।

অন্যদিকে, জার্মানিকে ফাইনাল অব্দি পৌঁছাতে তেমন বেগ পেতে হয়নি। প্রথম রাউন্ডে ৫ পয়েন্ট তুলে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন। তার মাঝে আবার যুগোস্লাভিয়াকে ৪-১ আর আরব আমিরাতকে ৫-১ গোলে উড়িয়ে দেয়ার কীর্তি! জার্মানি পরের তিন ধাপে নেদারল্যান্ড, যুগোস্লাভিয়া, ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ৮ জুলাইয়ে অলিম্পিকোতে।

ম্যারাডোনার সামনে তখন পর পর দুবার বিশ্বকাপ ট্রফিতে চুমু খাওয়ার হাতছানি। কিন্তু তা আর হয়নি। ১-০ গোলের হারে স্বপ্ন ভেঙ্গে যায় আর্জেন্টিনার। ফুটবলপ্রেমী কোটি দর্শকের মন ভেঙে হয় চৌচির। এমন ৯০ মিনিটের দ্বৈরথের ইতিহাস যে ঘটবে অলিস্পিকোতে তা কেউই ভাবতে পারেননি! না, আর্জেন্টিনার হেরে যাওয়ার জন্য নয়। সেদিন বিশ্ব দেখেছিল বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে ন্যাক্কারজনক কালো অধ্যায়- রেফারিং বিতর্ক!

বিশ্বকাপ ফুটবল ফাইনালের আনন্দ-উত্তেজনা সেদিন বিদায় নিয়েছিল অলিম্পিকো থেকে। পক্ষপাতদুষ্ট আর বাজে রেফারিং করে সেদিন বিশ্বকাপ ফুটবলের গায়ে কালিমা লাগান মেক্সিকান রেফারি এডগার্ডো কোডসাল। ম্যাচ শুরুর ১০ মিনিটের মাথায় জার্মানির আক্রমণ ভাগের খেলোয়াড় আর্জেন্টিনার ডি বক্সে বাধাহীন অবস্থায় পড়ে গেলেও রেফারি ফাউলের বাঁশি বাজান।

আর্জেন্টিনার মধ্যমাঠের খেলোয়াড় গুজতাভো ডেজত্তি তাতে অসন্তোষ জানান, পুরস্কার হিসেবে তাকে দেখতে হয় হলুদ কার্ড। রেফারির পক্ষপাতমূলক আচরণে সতর্ক হয়ে যায় ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা এবং সাথে সাথেই ম্যাচের ফর্মেশন বদলে ফেলেন। ৫-৪-১ এর ডিফেন্সিভ খেলা খেলতে বাধ্য হয় ম্যারাডোনারা, এই অবস্থায় শেষ হয় প্রথমার্ধ। ইতালির স্থানীয় টিভি চ্যানেলের ধারাভাষ্যকাররা মেক্সিকান রেফারি এডগার্ডো কোডসালের সমালোচনায় পার করেন বিরতি।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ৪৬ মিনিটে জার্মানির ক্লিন্সম্যানকে ফাউল করে লাল কার্ডে দেখেন আর্জেন্টাইন মনজোন। এর ১০ মিনিট পরই লাল কার্ড দেখতে হয় জর্জ বোরোচাজাকে। ৯ জনের দলে পরিণত হয় আর্জেন্টিনা। ম্যাচের ৮৪ মিনিটে জার্মানির পেড্রোকে দেখানো হয় লাল কার্ড।

৮৫ মিনিটে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড় ফাউল করলে পেনাল্টি পায় জার্মানি। পেনাল্টি শটে গোল করে ১-০ তে এগিয়ে যায় জার্মানি। তার কিছুক্ষণ পরেই আরো এক আর্জেন্টাইন খেলোয়াড় গুজতাভো দেজত্তিকে দ্বিতীয়বারের মতো হলুদ কার্ড দেখালে ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে আর্জেন্টিনা দল।

ম্যারাডোনা প্রতিবাদ জানালে তাকেও দেখতে হয় হলুদ কার্ড। শেষ পর্যন্ত ১-০ গোলের জয়ে ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপ শিরোপা চলে যায় জার্মানির ঘরে। এ ম্যাচে সর্বমোট ৫টি লালকার্ড দেখান রেফারি যার ৪টি-ই পায় আর্জেন্টিনা। ইতিহাসের পাতায় নাম লেখাতেই কি সেদিন এমন রেফারিং করেছিলেন মেক্সিকান রেফারি এডগার্ডো কোডসাল! কারণটা অবশ্য এখনো অজানাই। –