Beauty Bording (1)ইতিহাস ঐতিহ্যময় এ দেশে এমন অনেক গুরুত্বপুর্ন স্থান রয়েছে যা বাংলাদেশের গৌরবোজ্জল ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে আছে। কিন্তু এ সকল ঐতিহ্যবাহী স্থান সম্পর্কে বর্তমান প্রজন্মের কারোই খুব একটা ধারনা নেই। তেমনি একটি ঐতিহ্যময় স্থান পুরান ঢাকার বিউটি বোর্ডিং।

বাংলাদেশের অনেক প্রথিতযশা কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক,গায়ক, অভিনেতা, রাজনীতিবিদ, চিত্রশিল্পী, চিত্র পরিচালক সহ বিভিন্ন পেশার মানুষের পদচারনায় মুখরিত হতো বিউটি বোর্ডিং। এক সময় এখানেই নিয়মিত যাতায়াত করতেন নেতাজী সুভাস চন্দ্র বসু, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, কর্নেল অলি আহাদের মত যুগান্তকারী রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্ব। বিউটি বোর্ডিংয়ের এ ক্যান্টিনে বসেই প্রতিদিন চায়ের কাপের সাথে আড্ডার ঝড় তুলতেন নির্মলেন্দু গুণ, শহীদ কাদরী, কবি শামসুর রহমান, আল মা‏হমুদ ও শামসুল হকের মত কবি সাহিত্যিকেরা।

বিউটি বোর্ডিং এ শুধু আড্ডাই চলতো না এর পাশাপাশি এখানে চলতো বিতর্ক, সাহিত্যচর্চা, মতবিনিময় সব কিছুই। আর তাই ঢাকার ইতিহাস-ঐতিহ্যের খুব বড় একটি অংশ হিসেবে স্থান দখল করে আছে বিউটি বোর্ডিং। ১ নং শ্রীশ দাস লেনস্থ বিউটি বোর্ডিংয়ের দোতলা বিল্ডিংটি সেই ১৯৫০ সাল থেকেই ঠিক একই ভাবে মাথা উচু করে দাড়িয়ে আছে পুরান ঢাকার বুকে।

বিউটি বোর্ডিংয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রহল্লাদ সাহা ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। তিনি পশ্চিমবঙ্গ থেকে তামাক পাতা এনে বিক্রি করতেন।বিউটি বোর্ডিংয়ের বাড়িটিতে আগে সাপ্তাহিক সোনার বাংলার অফিস ছিলো যা ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর কোলকাতায় স্থানান্তরিত হয়। তখন বাড়িটি বিক্রি হবে শুনে প্রহল্লাদ সাহা বাড়িটি কিনে নেন এবং বাড়িটিকে বোর্ডিংয়ে রুপান্তরিত করেন। প্রহল্লাদ সাহার বড় মেয়ের নামে বোর্ডিংটির নামকরন করা হয় বিউটি বোর্ডিং।

Beauty Bording (5)১৯৭১ সালের ২৮ শে মার্চ বুুদ্ধজীবীদের আড্ডাস্থল হিসেবে পরিচিত হবার ফলে পাকিস্তানী সেনারা প্রহল্লাদ সাহা সহ বিউটি বোর্ডিংয়ের আরও ১৭ জন বোর্ডার এবং স্টাফকে ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করে। ১৯৪৭ সালে থেকেই বাংলাবাজার ঢাকার মুদ্রন ও প্রকাশনা শিল্পের কেন্দ্রস্থল ছিল আর তাই সে সময় থেকেই বিউটি বোর্ডিং হয়ে ওঠে কবি,সাহিত্যিক ও গবেষকদের আড্ডাস্থল। কিন্তু ১৯৭১ সালে প্রহল্লাদ সাহার মৃত্যুর ফলে থমকে যায় বিউটি বোর্ডিংয়ের পথচলা এবং তার গোটা পরিবার কোলকাতায় চলে যায়।

দেশ স্বাধীন হবার পর পুনরায় তারা দেশে ফিরে আসেন। আবার নতুন করে প্রান ফিরে পায় বিউটি বোর্ডিং। বর্তমানে প্রহল্লাদ সাহার ছেলে তারক সাহা ও সমর সাহা দুজন মিলে বিউটি বোর্ডিং পরিচালনা করছেন । বিউটি বোর্ডিংয়ের গেট দিয়ে ঢুকতেই চোখে পড়ে সুন্দর সবুজ লন। লনের পাশে এখনো মাথা উচু করে প্রায় ১৫০ বছরের ইতিহাস,ঐতিহ্য ও অহংকার নিয়ে দাড়িয়ে আছে চিরচেনা বিউটি বোর্ডিংয়ের দোতলা ভবনটি। সামনেই অফিস ঘর ও ক্যান্টিন। এ ক্যান্টিনের মত সল্প দামে চা,সিঙ্গারা,চপ,কাটলেট আশেপাশের আর কোথাও পাওয়া যেত না। এখনো এখানে যে সকল সুস্বাদু খাবার পাওয়া যায় যা অন্য কোথাও পাওয়া যায়না। ক্যান্টিনে গেলেই পুরোনো ঢাকার বাহারি খাদ্য খানা ও ঢাকার মানুষের বিচিত্র খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে ধারনা মেলে। ক্যান্টিনের ভেতর সারিবদ্ধ চেয়ার টেবিল দেখলেই বোঝা যায় যে,এখানে নিয়মিত খাওয়া দাওয়া হয়।

বর্তমানে বিউটি বোর্ডিংয়ে রাতে থাকার ব্যবস্থাও রয়েছে। যার ভাড়া ১০০ থেকে ২২০ টাকার মধ্যে। রুম ও সুযোগ সুবিধার ওপর রুমের ভাড়া নির্ভর করে। বিউটি বোর্ডিংয়ের পরিচালক তারক সাহার সাথে কথা বলে জানা যায়,“এখনও এখানে যারা আড্ডা দিতে আসেন এদের মধ্যে প্রানেশ সমাদ্দার, ডা:আর.এম দেব নাথ,সানাউল হক খান, কবি ইমরুল চৌধুরী, ফটোগ্রাফার বিজন সরকার, সাংবাদিক মৃনাল কান্তি রায়, রফিকুল হক দাদুভাই, নির্মলেন্দু গুণ, অসীম সাহা উল্লেখ যোগ্য। সুযোগ পেলেই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন আয়োজনের মাধ্যমে এ ধরনের আড্ডার আসর প্রায়ই বসানো হয় বিউটি বোর্ডিংয়ে। যে দীর্ঘ দিনের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাী হয়ে আছে বিউটি বোর্ডিং, তা অব্যাহত রাখতে চাই। বিউটি বোর্ডিং আমাদের সকলের ঐতিহ্য, আমার বাবার স্মৃতি, অনেক বিশিষ্ট ব্যাক্তিত্বের মধুময় অতীত ও আমাদের অহংকার”। Beauty Bording (3)